পবিত্র মীলাদ শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ খাছ সুন্নত হওয়ার প্রমাণ (ফরয পরিমাণ ইলম)
পবিত্র মীলাদ শরীফ পাঠ করা ও পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মধ্যে ক্বিয়াম শরীফ করা খাছ সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত। কেননা, ইযযুল আরাবী ওয়াল আজম, খতীবুল আম্বিয়ায়ি ওয়াল উমাম, শামসুল ফালাহি ওয়াস সালাম, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সময় থেকেই পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার এ ফযীলতপূর্ণ আমলটি পালিত হয়ে আসছে। কাজেই এটি নতুন কোন আমল নয়।
‘মীলাদ’ শরীফ উনার লুগাতী বা আভিধানিক অর্থ হলো- ‘জন্মের সময়’। আর ইছতিলাহী বা ব্যবহারিক অর্থ হলো সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্রতম বিলাদত শরীফ উপলক্ষে ছানা-ছিফত মুবারক করা ও উনার প্রতি ছলাত-সালাম মুবারক পাঠ করা; যা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের নির্দেশ মুবারক উনাদের অন্তর্ভুক্ত।
এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اِنَّا اَرْسَلْنٰكَ شَاهِدًا وَّمُبَشّرًا وَّنَذِيرًا. لّتُؤْمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه وَتُعَزّرُوْهُ وَتُوَقّرُوْهُ وَتُسَبّحُوْهُ بُكْرَةً وَّاَصِيْلًا.
অর্থ : “(হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষীদাতা, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীস্বরূপ পাঠিয়েছি, যেন (হে মানুষ!) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর এবং উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ঈমান আনো এবং তোমরা উনার খিদমত মুবারক কর ও উনার তা’যীম-তাকরীম মুবারক কর এবং উনার ছানা-ছিফত মুবারক কর সকাল-সন্ধ্যা অর্থাৎ সদাসর্বদা।” (পবিত্র সূরা ফাতহ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৮-৯)
আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
اِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيّ ۚ يَآ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلّمُوْا تَسْلِيْمًا.
অর্থ : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার সম্মানিত হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা হযরত নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত শরীফ পাঠ করেন। হে মু’মিনগণ! তোমরাও হযরত নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত তথা দুরূদ শরীফ পাঠ কর এবং সালাম মুবারক প্রেরণ কর প্রেরণ করার মতো।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৬)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَةْ اَبِى الدَّرْدَاءِ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ اَنَّه مَرَّ مَعَ النَّبِىّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلٰى بَيْتِ عَامِرِ الاَنْصَارِىّ وَكَانَ يُعَلّمُ وَقَائِعَ وِلادَتِه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِاَبْنَائِهٖ وَعَشِيْرَتِه وَيَقُوْلُ هٰذَا الْيَوْمَ هٰذَا الْيَوْمَ فَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَامُ اِنَّ اللهَ فَتَحَ لَكَ اَبْوَابَ الرَّحْـمَةِ وَالْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ لَكَ مَنْ فَعَلَ فِعْلَكَ نَـجٰى نَـجٰتَكَ.
অর্থ : “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি সাইয়্যিদুনা রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত আমির আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার তাশরীফ মুবারক নিয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি উনার সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশী উনাদেরকে নিয়ে আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ সম্বলিত ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস; এই দিবস (অর্থাৎ ১২ রবীউল আউওয়াল শরীফ-এ রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ মুবারক এনেছেন এবং ইত্যাদি ইত্যাদি মুবারক ঘটনা ঘটেছে)।
এতদশ্রবণে মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত উনার দরজা মুবারক আপনার জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ আপনার মতো এরূপ কাজ করবেন, তিনিও আপনার মতো নাযাত (ফযীলত) লাভ করবেন।” সুবহানাল্লাহ!
দলিল: আত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর- শায়খ হাফিয আবিল খত্তাব ইবনে দাহিয়্যা, মাওলূদুল কাবীর- লি-ইমাম হাফিয ইবনে হাযার মক্কী, দুররুল মুনাযযাম- লিল আল্লামা আবিল ক্বাসিম মুহম্মদ বিন উছমান, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, ইশবাউল কালাম ফী ইছবাতিল মাওলিদি ওয়াল ক্বিয়াম- মাওলানা সালামতুল্লাহ ছিদ্দীক্বী কানপুরী, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী- বেশারতুল্লাহ মাদানীপুরী, আল বাইয়্যিনাত শরীফ
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَةْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا اَنَّه كَانَ يُـحَدّثُ ذَاتَ يَوْمٍ فِىْ بَيْتِه وَقَائِعَ وِلادَتِه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْمٍ، فَيَسْتَبْشِرُوْنَ وَيُحَمّدُوْنَ اللهَ وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاِذَا جَاءَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ حَلَّتْ لَكُمْ شَفَاعَتِىْ.
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা উনার নিজগৃহে সমবেত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ সম্বলিত ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছিলেন। এতে শ্রবণকারীগণ আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করছিলেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার প্রশংসা তথা তাসবীহ-তাহলীল মুবারক পাঠ করছিলেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত শরীফ (দরূদ ও সালাম মুবারক) পাঠ করছিলেন।
এমন সময় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তথায় তাশরীফ মুবারক নেন এবং (মীলাদ শরীফ পাঠের অনুষ্ঠান দেখে) বললেন: আপনাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব।” সুবহানাল্লাহ! (আত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর- শায়খ হাফিয আবিল খত্তাব ইবনে দাহিয়্যা, মাওলূদুল কাবীর- লি-ইমাম হাফিয ইবনে হাযার মক্কী, দুররুল মুনাযযাম- লিল আল্লামা আবিল ক্বাসিম মুহম্মদ বিন উছমান, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, ইশবাউল কালামি ফী ইছবাতিল মাওলিদি ওয়াল ক্বিয়াম- মাওলানা সালামাতুল্লাহ ছিদ্দীক্বী কানপুরী, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী- বেশারতুল্লাহ মাদানীপুরী, আল বাইয়্যিনাত শরীফ)
সম্মানিত ক্বিয়াম শরীফ উনার প্রমাণ :
উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার সাথে পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ উনার বিষয়টিও সম্পৃক্ত রয়েছে। কারণ মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন উক্ত পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মজলিসে তাশরীফ মুবারক নিলেন তখন সমবেত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা দাঁড়িয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সালাম পেশ করে অভ্যর্থনা জানিয়ে আসনে বসালেন।
হয়তবা কেউ বলতে পারে যে, ‘উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে তো পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ করা বা দাঁড়িয়ে সালাম দেয়ার কথা উল্লেখ নেই।’
হ্যাঁ, উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে যেরূপ পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ করার কথা উল্লেখ নেই, তদ্রুপ ক্বিয়াম শরীফ করেননি একথাও তো উল্লেখ নেই। তবে বাস্তবতা ও অন্যান্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উক্ত পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মজলিসে ক্বিয়াম শরীফ করেছেন। কারণ, বর্ণিত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে যে-
جَاءَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
অর্থ : “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উক্ত পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মজলিসে স্বশরীর মুবারকে উপস্থিত হলেন।”
আর এটা বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমনে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনারা উনার সম্মানার্থে ‘ক্বিয়াম শরীফ’ করেছেন।
কারণ, অন্যান্য বহু পবিত্র হাদীছ শরীফ প্রমাণ করে যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মজলিসে তাশরীফ মুবারক নিতেন তখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উনার সম্মানার্থে ‘ক্বিয়াম শরীফ’ করতেন। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
عَنْ حَضْرَةْ اَبِـىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَـجْلِسُ مَعَنَا فِى الْـمَسْجِدِ يُـحَدّثُنَا فَاِذَا قَامَ قُمْنَا قِيَامًا حَتّٰى نَرَائَه قَدْ دَخَلَ بَعْضَ بُيُوْتِ اَزْوَاجِه.
অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “একদা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদের মাঝে বসে আমাদেরকে নছীহত মুবারক বা ওয়ায মুবারক করছিলেন। যখন তিনি উঠলেন বা দাঁড়ালেন, আমরাও সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ আমরা উনাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকি উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু আনহুন্না উনাদের ঘর মুবারক-এ প্রবেশ না করা পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়েই রইলাম।” (বাইহাক্বী ফী শুয়াবিল ঈমান শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত শরীফ, লুময়াত শরীফ, শরহুত ত্বীবী শরীফ, মুযাহিরে হক্ব শরীফ, তা’লীকুছ ছবীহ শরীফ)
অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে-
عَنْ اُمّ الْـمُؤْمِنِيْنَ حَضْرَةْ عَائِشَةَ عَلَيْهَا السَّلَامُ كَانَتْ اِذَ دَخَلَتْ عَلَيْهِ قَامَ اِلَيْهَا فَاَخَذَ يَدَهَا فَقَبَّلَهَا وَاَجْلَسَهَا فِىْ مَـجْلِسِه وَكَانَ اِذَا دَخَلَ عَلَيْهَا قَامَتْ لَه فَاَخَذَتْ بِيِدِه فَقَبَّلَتْهُ وَاَجْلَسَتْهُ فِىْ مَـجْلِسِهَا.
অর্থ : উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি যখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট তাশরীফ মুবারক নিতেন, তখন তিনি (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মেয়ের মুহব্বতে) দাঁড়িয়ে যেতেন এবং উনার হাত মুবারকে বুছা বা চুমা দিয়ে নিজের স্থানে বসাতেন। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা আলাইহাস সালাম উনার নিকট তাশরীফ মুবারক নিতেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাত মুবারকে বুছা বা চুমা দিয়ে নিজের স্থান মুবারক-এ বসাতেন।”
দলিল: আবূ দাঊদ শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ, বযলুল মাজহুদ শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত শরীফ, মুযাহিরে হক্ব শরীফ, তা’লীকুছ ছবীহ শরীফ, শরহুত ত্বীবী শরীফ
এখন কেউ কেউ এ প্রশ্নও করতে পারে যে, ঠিক আছে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বশরীর মুবারক-এ উক্ত পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মজলিসে তাশরীফ মুবারক নেয়ার কারণে উনার সম্মানার্থে ক্বিয়াম শরীফ করেছেন। কিন্তু বর্তমান পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার সকল মজলিসেই কি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাশরীফ মুবারক নেন? যদি তাশরীফ মুবারক না নেন তবে ক্বিয়াম শরীফ করা হয় কেন?
এর জবাবে বলতে হয় যে, মূলত পবিত্র মীলাদ শরীফ-এ যে ক্বিয়াম শরীফ করা হয় তা শুধু সুন্নতই নয় বরং আদব, শরাফত ও তা’যীম বা সম্মানার্থেই করা হয়। অর্থাৎ আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি সালাম পেশ করার সময় ক্বিয়াম শরীফ করা বা দাঁড়িয়ে ‘সালাম’ দেয়াই সুন্নত ও আদব। চাই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাশরীফ মুবারক নেন অথবা না নেন। সর্বাবস্থায় দাঁড়িয়ে সালাম দেয়াই সুন্নত, আদব, শরাফত ও ভদ্রতা।
স্মর্তব্য যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সর্বাবস্থায় তা’যীম মুবারক বা সম্মান মুবারক করতে হবে।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এ পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় যেভাবে তা’যীম মুবারক বা সম্মান মুবারক করতে হত, উনার পবিত্র বিছাল শরীফ উনার পরও সমানভাবে তা’যীম মুবারক বা সম্মান মুবারক করতে হবে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক উপস্থিতিতে যেমন সম্মান মুবারক করা হত, উনার অনুপস্থিতিতে ঠিক তদ্রুপ সম্মান মুবারক করতে হবে। হযরত ক্বাজী আয়ায রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘শিফা শরীফ’-এ বর্ণনা করেছেন-
اِنَّ حُرْمَةَ النَّبِىّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ مَوْتِه وَتَوْقِيْرَه وَتَعْظِيْمه لَازِمٌ كَمَا حَالِ حَيَاتِه وَذٰلِكَ عِنْدَ ذِكْرِه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذِكْرِ حَدِيْثٍ وَسُنَّةٍ وَسِـمَاعِ اِسْـمِه وَسِيْرَتِه وَمُعَامِلَةِ اٰلِه وَعِتْرَتِه.
অর্থ : “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছাল শরীফ উনার পর উনার ইজ্জত, সম্মান, মর্যাদা মুবারক ঠিক তেমনভাবে অবশ্যকরণীয় কর্তব্য হবে; যেমন উনার যমীনে অবস্থানকালে কর্তব্য ছিল এবং তা করতে হবে উনার ছানা-ছিফত মুবারক আলোচনা কালে, পবিত্র হাদীছ শরীফ, সুন্নাহ শরীফ মুবারক আলোচনা কালে, নাম মুবারক, জীবনী মুবারক, আচার-আচরণ মুবারক ইত্যাদি আলোচনা ও শুনা কালে এবং উনার পরিবার অর্থাৎ আহাল ও ইয়াল আলাইহিমুস সালাম উনাদের আচার-ব্যবহার আলোচনা মুবারক উনার সময়েও।”
দলিল: শিফা শরীফ ২য় খ- পৃষ্ঠা ৪০
অতএব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তা’যীম-তাকরীম মুবারক পৃথিবীতে থাকাকালে যেমন ছিল ঠিক তেমনিভাবে উনার বিছাল শরীফ উনার পরও থাকবে। এ জন্যে হযরত ক্বাজী আয়ায রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে হযরত আবূ ইবরাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বক্তব্যকে উল্লেখ করে লিখেন-
وَاجِبٌ عَلٰى كُلّ مُؤْمِن مَتٰى ذَكَرَه اَوْ ذُكِرَ عَنْدَه اَنْ يَّـخْضَعَ وَيَـخْشَعَ وَيَتَوَقَّرَ وَيَكُنْ مّنْ حَرَكَتِه وَيَأْخُذَ بِه نَفْسَه لَوْ كَانَ بَيْنَ يَدَيهِ وَيَتَادَّبَ اَدَّبَنَا اللهُ بِه.
অর্থ : “প্রত্যেক মু’মিনের জন্যে ওয়াজিব হল যে, যখনই সে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছিফত মুবারক করবে বা উনার নিকট বা উনার মুবারক উপস্থিতিতে অথবা উনার অনুপস্থিতিতে আলোচনা মুবারক করা হবে, যেন অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে যায় এবং নড়া-চড়া বন্ধ করে ভাবমুগ্ধ অবস্থায় চূড়ান্ত আদব সহকারে এমনভাবে সম্মান করে যেমন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বশরীর মুবারক-এ উনার সম্মুখে উপস্থিত হলে করতো এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মুখে যেমন আদব করার নির্দেশ মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে প্রদান করেছেন। ঠিক তেমনিভাবে আদব প্রদর্শন করতে হবে।” (শিফা শরীফ ২য় খ- পৃষ্ঠা ৪০)
এ প্রসঙ্গে মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর খলীফা মাওলানা শামছুল হক্ব ফরীদপুরী তার ‘তাছাওউফ তত্ত্ব’ নামক কিতাবে ৪১ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছে, “হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সালাম দেয়ার সময় বসে বসে সালাম দেয়া শরীফ তবীয়তের লোকের কাছে বড়ই বেয়াদবী লাগে। সেজন্য রওযা শরীফ উনার সামনে নিজেকে হাজির ধ্যান করে খাড়া হয়ে সালাম দেয়াতে কোনই দোষ হতে পারেনা। যেমন পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মধ্যে রওযা শরীফ উনার সামনে সালাম দেয়ার সময় সকলেই দাঁড়াইয়া সালাম দিয়ে থাকেন।”
মাওলানা শামসুল হক ফরীদপুরীর উক্ত বক্তব্য দ্বারাও প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মধ্যে যে ক্বিয়াম শরীফ করা হয়, তা মুহব্বত, আদব, শরাফত ও তা’যীমার্থে করা হয়। এখানে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখা ও না দেখার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।
তাছাড়া ক্বিয়াম শরীফ বিরোধীরা কি এরূপ একখানা দলীল পেশ করতে পারবে? যেখানে উল্লেখ আছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সালাম দেয়ার সময় দাঁড়িয়ে সালাম দেয়া নিষেধ বা নাজায়িয। মূলত একখানা দলীলও তারা পেশ করতে পারবেনা। যদি তাই হয়ে থাকে তবে ক্বিয়াম শরীফ করাকে বা দাঁড়িয়ে সালাম দেয়াকে কি করে নাজায়িয ও বিদয়াত বলা যেতে পারে? বস্তুত পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মধ্যে ক্বিয়াম শরীফ করা হচ্ছে, খাছ সুন্নত ও আদবের অন্তর্ভুক্ত। আর আদব রক্ষা করা ফরযের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই আমল উনাকে বিদয়াত ও নাজায়িয বলা সুস্পষ্ট কুফরী।
উল্লেখ্য, বিশ্বখ্যাত ফিক্বাহ উনার কিতাব রদ্দুল মুহতার ও হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ কিতাবে উল্লেখ আছে যে, ক্বিয়াম তিন প্রকার-
(১) ক্বিয়ামে তাকাব্বুরী : এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- لَاتَقُوْمُوْا كَمَا يَقُوْمُ الْاَعَاجِمُ
অর্থ : “আপনারা আজমীদের মত (মাথা নিচু করে নমস্কারের ছূরতে) দাঁড়াবেন না।” এরূপ ক্বিয়াম ইসলামী শরীয়ত উনার আলোকে সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম।
(২) ক্বিয়ামে হুব্বী : যেমন- সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত ফাতিমাতুয যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হুজরা শরীফ মুবারক-এ তাশরীফ মুবারক নিলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার মুহব্বতে দাঁড়িয়ে যেতেন, এটাকে ক্বিয়ামে হুব্বী বলে।
(৩) ক্বিয়ামে তা’যীমী : যেমন- সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তা’যীমের জন্য দাঁড়াতেন; যা উল্লিখিত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
মূল কথা হলো- ক্বিয়ামে তাকাব্বুরী ইসলামী শরীয়ত উনার আলোকে নাজায়িয, হারাম ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ। আর ক্বিয়ামে হুব্বী ও ক্বিয়ামে তা’যীমী ইসলামী শরীয়ত উনার আলোকে জায়িয ও সুন্নত।
অতএব, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের উপরোক্ত দলীল-প্রমাণের আলোকেই প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ উভয়টিই খাছ সুন্নত উনার অন্তর্ভুক্ত। আর সুন্নত উনার বিরোধিতা করা প্রকাশ্য কুফরীর শামিল।
লেখক: মাওলানা মুহম্মদ ফজলুল হক্ব,
হাফিজুল হাদিস, গবেষক

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন